যুক্ত নাকি সূদ মুক্ত ব্যাংকিং, এধরনের প্রশ্ন ছিলনা। তারাই প্রথম এদেশের সাধারন মানুষের কাছে (বিশেষতঃ এদেশের মুসলিমদের কাছে) এই প্রশ্নটি দাঁড় করায়। ফলে অশিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত বা স্বল্প ইসলাম জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের কাছে এই ধারনাটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। বর্তমানে “ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড” বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারী ব্যাংকে পরিনত হয়েছে। টাকার অঙ্ক, সূদের হার ইত্যাদি সংখ্যা দিয়ে এই লেখাটিকে ভারাক্রান্ত করার ইচ্ছে লেখকের নেই। জ্ঞানী পাঠক মাত্র সত্যগুলো জানেন। যে কেউ চাইলে ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইটগুলো থেকেও তথ্য জানতে পারেন। মূলধারার ব্যাংকিং-এর সাথে ইসলামী ব্যাংকিং-এর প্রধাণ পার্থক্য দুটোর দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। ‘খ’ যদি ‘ক’-এর কাছ থেকে কিছু টাকা এই শর্তে ধার করেন যে, যতদিন পর্যন্ত না ‘খ’ ‘ক’ কে ধার করা সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দিচ্ছেন, ততদিন পর্যন্ত ‘খ’ ‘ক’ কে অতিক্রান্ত সময়ের উপর একটি নির্দিষ্ট হারে অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য থাকবেন। বস্তুতঃ অতিক্রান্ত সময়ের উপর নির্দিষ্ট হারে প্রদেয় এই অতিরিক্ত টাকাই সূদ। কিন্তু ‘খ’ এবং ‘ক’ -এর মধ্যকার শর্তটা যদি এমন হতো যে, ধার করা টাকা ব্যবসাতে বিনিয়োগ করে ‘খ’ যে পরিমান মুনাফা করবেন তার একটি অংশ ‘ক’ কে দিতে বাধ্য থাকবেন, তাহলেই তাকে আর সূদ বলা যেত না। কারন, এই মুনাফার হার নির্দিষ্ট নয়। এটি শূন্য থেকে যে কোন সংখ্যা হতে পারে। আর ‘ক’ যদি ‘খ’-এর ব্যবসায়ের সম্ভাব্য ক্ষতির ভাগও নেন তাহলে তিনি ব্যবসায়ের অংশীদার হিসেবে বিবাচিত হবেন। কেঊ যখন কোন ইসলামী ব্যাংকে টাকা আমানত (Deposit) রাখেন, তখন উক্ত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারীকে বৎসরান্তে নির্দিষ্ট হারে ‘লাভ’ দেবার প্রতিশ্রুতিই দেয়। এক জন মুসলিম একথা বিশ্বাস করতে বাধ্য যে, বৎসরান্তে ব্যবসায়ে কি পরিমান ‘লাভ’ হতে পারে, অথবা আদৌ ‘লাভ’ হবে কিনা তা কেবল আল্লাহ-ই জানেন। কারন, ঈমানে মুফাসসালে বলা আছে, “তকদীরের ভালো-মন্দ একমাত্র আল্লাহর হাতে”। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংক যদি আমানতকারীকে বৎসরান্তে নির্দিষ্ট হারে ‘লাভ’-এর নিশ্চয়তা দেয় তবে তা ঈমানে মুফাসসালের পরিপন্থী বা ‘কুফরী’ বলে গন্য হবার কথা। একই ভাবে বৎসরান্তে পূর্ব প্রতিশ্রুত হারে প্রদেয় টাকা সূদ ভিন্ন কিছু না। আবার কেউ যখন কোন ইসলামী ব্যাংক হতে টাকা ধার করেন, তখন উক্ত ইসলামী ব্যাংক ঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে বৎসরান্তে নির্দিষ্ট হারে ‘লাভ’ পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতিই আদায় করেন।
এক্ষেত্রেও, যেহেতু ঋণ গ্রহীতা একথা আদৌ জানেন না যে বৎসরান্তে তিনি কোন প্রকার মুনাফা করতে পারবেন কিনা, সুতরাং ইসলামী ব্যাংককে তার দেয়া বৎসরান্তে নির্দিষ্ট হারে ‘লাভ’ পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি বস্তুতঃ সূদ পরিশোধেরই প্রতিশ্রুতি। এবং বৎসরান্তে ইসলামী ব্যাংককে তিনি মূল ঋণকৃত টাকার পরিমানের বাইরে যা পরিশোধ করেন তা বিশুদ্ধ সূদ বই অন্য কিছুনা।
সূদ দেবার বা নেবার ভিত্তিতেই করে থাকে। দেশে বা দেশের বাইরে আন্তঃব্যাংক যে লেন-দেন হয় তাও সম্পূর্ণরূপে সূদ দেবার বা নেবার ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। সুতরাং “সম্পূর্ন সূদ মুক্ত ব্যাংকিং” সোনার পাথর-বাটি ছাড়া অন্য কিছুনা।</p> অনাগত সময়ের উপর নির্দিষ্ট হারে ‘লাভ’ আদায় করা বা পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে
ঈমান-আকীদার পরিপন্থী। একই ভাবে এব্যাপারে সাধারণ মানুষকে ভুল ধারনা দেয়াও ইসলাম পরিপন্থী। শরীয়ত বিরোধী ব্যবসাতে বিনিয়োগ, পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের নিয়োগ প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রমও ইসলাম পরিপন্থী। এসমস্ত ইসলাম পরিপন্থী কাজ প্রত্যেকটি ইসলামী ব্যাংকই করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর শরীয়ত মোতাবেক কার্যক্রম পরিচালনা করার দাবীও তাই সবৈর্ব মিথ্যা। সাম্প্রতিককালে কিছু কিছু আলেম এই বলে সাফাই গান যে অন্যান্য মূলধারার ব্যাংকের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকগুলো অধিক ইসলাম-সম্মত। অথচ তারা এই সত্যটি চেপে যান যে, ইসলামে আধা-আধি বা আংশিক বিধান পালনের কোন সুযোগ নেই। মিথ্যা বলা, চুরি করা, নেশা করা, জ্বেনা করা, পরের সম্পদ লুন্ঠন করা, নামাজ-রোজা-যাকাত অনাদায়ী রাখা ইত্যাদি ইসলামী বিধান অনুযায়ী নিষিদ্ধ। এর কোনটাই আংশিকভাবেও করা যাবে না। করলে তার জন্য পরকালে কঠিন আযাবের সম্মূখীন হতে হবে। সূদও ইসলাম বিরোধী। কণামাত্র সূদের সংস্রব থাকাও তাই ইসলাম বিরোধী। যে সত্যটি এসমস্ত ইসলামী ব্যাংক বা ঐ সমস্ত আলেমগণ বলেননা তা হচ্ছে, সূদবিহীন ব্যাংক ব্যবস্থা হয় না। তাই রাসুল (সাঃ) বা খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময় রাষ্ট্রিয় কোষাগার ছাড়া অন্য কোন ব্যাংক ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানে ইসলামী পরিভাষা ব্যবহার করে সূদী কারবারকে “ইসলামী” রূপ দেবার চেষ্টা ধর্মকে ব্যবহার করে ব্যবসা করার এক ফন্দি ছাড়া অন্য কিছু না। এতে সাধারণ আমানতকারী বা ঋণ গ্রহীতাদের ঈমান নষ্ট হয় কিনা বলতে পারবোনা, তবে ইসলামী ব্যাংকগুলো আর তাদের ভাড়াটে মোল্লাদের যে পকেট ভারী হয় সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।


